মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা বাড়ানোর স্নায়ুবৈজ্ঞানিক কৌশল
মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা বাড়ানোর স্নায়ুবৈজ্ঞানিক কৌশল
মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা বাড়ানোর জন্য স্নায়ুবৈজ্ঞানিক
গবেষণা বিভিন্ন কার্যকর কৌশল প্রস্তাব করে। এসব কৌশল মস্তিষ্কের নিউরোপ্লাস্টিসিটি
(neuroplasticity) বাড়াতে, মনোযোগ বৃদ্ধি করতে এবং মস্তিষ্ককে দীর্ঘমেয়াদে সুস্থ রাখতে
সাহায্য করে। নিচে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কৌশল উল্লেখ করা হলো:
ঘুম
মস্তিষ্কের বিকাশের প্রাথমিক পর্যায়ের ক্রিয়াকলাপগুলোর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ ঘুম
। সুস্থ স্বাভাবিক মস্তিষ্ক প্রাথমিক জীবনে সুস্থ বুদ্ধিদীপ্ত এবং মনোসামাজিক
বিকাশ সঠিকভাবে ঘটাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। স্নায়ু গবেষক ড্যানিয়েল
লেভিটিন বলেছেন, 'আপনি যদি রাতে ভালো ঘুমাতে না পারেন, তবে দিনের
ঘটনাগুলো স্মৃতিতে সঠিকভাবে এনকোড করা হয় না।' অর্থাৎ রাতে
বিশুদ্ধভাবে তথা ভালো ঘুমানো হচ্ছে মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা বাড়ানোর অন্যতম কৌশল।
খাবার
পুষ্টিকর সুষম খাবার মস্তিষ্কের গঠন ও বিকাশের পাশাপাশি কর্মক্ষমতা বাড়ানোর
জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। তাই মস্তিষ্কের সুস্বাস্থ্যের জন্য ডাল, বাদাম, তৈলাক্ত
খাবার, ওমেগা ফ্যাটি অ্যাসিড সমৃদ্ধ খাবার, তাজা ফল, সবুজ শাকসবজিসহ আমিষ জাতীয় খাবার নিয়মিত
পরিমাণমতো খেতে হবে। কারণ, সুস্বাস্থ্যের মধ্য দিয়েই মূলত
মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা বাড়ে। বিপরীতে ধূমপান, মদ্যপান,
তামাক, অতিরিক্ত চা-কফি খাওয়া মস্তিষ্কের ওপর
খারাপ প্রভাব ফেলে। এসব অভ্যাস থেকে বিরত থাকতে হবে। অধ্যাপক ট্রেভর রবিন্স বলেছেন,
'ধূমপান সম্ভবত বিশ্বের সবচেয়ে সাধারণ আসক্তিমূলক আচরণ এবং
প্রাপ্তবয়স্কদের মৃত্যুর একটি প্রধান কারণ।'
শরীরের যত্ন
মস্তিষ্ক শরীরের একটি অঙ্গ। তাই শরীরের যত্ন না নিলে মস্তিষ্কেরও অযত্ন হয়।
পুরো শরীর সচল এবং কর্মক্ষম রাখতে খাবার ও ঘুমের পাশাপাশি শরীরচর্চাও খুব জরুরি।
শরীর সচল থাকলে কায়িক শ্রমের মাধ্যমে মস্তিষ্কের রক্ত চলাচল বাড়ে। এর মধ্য দিয়ে
মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতাও বাড়ে। স্নায়ুবিজ্ঞানী আন্তোনিও দামাসিওর মতে, 'বিচ্ছিন্ন মন বলে কিছু নেই।
মন মস্তিষ্কে রোপণ করা হয় এবং মস্তিষ্ক শরীরে বসানো হয়।' তাই
শরীরের যত্নের প্রতি মনোযোগী হতে হবে। এ ছাড়া মস্তিষ্কের জন্য নির্ধারিত কিছু
ব্যায়াম বা অনুশীলনও করা যেতে পারে।
অলসতা দূর
মস্তিষ্ক সজাগ ও তীক্ষ্ণ রাখার অন্যতম উপায় হলো কোনো কিছুর চর্চা করা। এ
ক্ষেত্রে গণিত চর্চা বা কারও সঙ্গে যুক্তিভিত্তিক কোনো বিষয়ে আলোচনা করা যেতে
পারে। পাশাপাশি সামাজিক হতে শেখাও মস্তিষ্কের সঠিক বিকাশের জন্য জরুরি। কোনো কিছু
বারবার চর্চা করলে মস্তিষ্কের দৃঢ়তা বাড়ে। মনে রাখবেন, অতিরিক্ত চাপ নেওয়া যাবে না।
মাঝে মাঝে বিরতি নিতে হবে।
ইতিবাচক চিন্তা ও আত্মবিশ্বাস
নেতিবাচক চিন্তা মস্তিষ্কের ওপর খুব খারাপ প্রভাব ফেলে। অন্ধকারে অনেক বেশি
একা সময় কাটানোর অভ্যাস ত্যাগ করুন। এতে নেতিবাচক চিন্তা আসতে পারে। নেতিবাচক
চিন্তার বদলে সব সময় হাসিখুশি থাকার চেষ্টা করতে হবে। আত্মবিশ্বাস গঠন হয় এমন সব
সৃজনশীল কাজের চর্চা করতে হবে। এর মধ্য দিয়ে মস্তিষ্কে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। আর
ইতিবাচক চিন্তার ফলে আত্মবিশ্বাস বাড়ে, যা মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা বাড়াতে সহায়ক।
ক্রিস্টফ কোচের মতে, একটি সিদ্ধান্ত নিন, নিজেকে বিশ্বাস করুন এবং এটির সঙ্গে লেগে থাকুন।'
ইলেকট্রনিক ডিভাইস
হেডফোনে দীর্ঘ সময় কিছু শুনতে থাকলে সেটিও মস্তিষ্কের ওপর খারাপ প্রভাব
ফেলে। যেকোনো স্ক্রিনের সামনে বেশি সময় কাটালেও চোখ ও মস্তিষ্কের ক্ষতি হয়। সামাজিক
যোগাযোগমাধ্যমে কম সময়ের ভিডিও, আলোকচিত্র অতিরিক্ত দেখলে মানুষের মনোযোগের দীর্ঘতা কমে
যায়, পাশাপাশি সৃজনশীলতাও নষ্ট হতে থাকে। স্নায়ুবিজ্ঞানী
ড্যানিয়েল লেভিটিন বলেছেন, 'বেশির ভাগ কাজের জন্য কিছু
সৃজনশীলতা এবং নমনীয় চিন্তাভাবনা প্রয়োজন।' তাই নিজের পরিবার,
সমাজ, প্রকৃতির সঙ্গে সময় কাটানো এবং সৃজনশীল
কাজে অংশ নেওয়ার বিষয়ে গুরুত্ব দিন।
নতুন চ্যালেঞ্জ
নিন
মস্তিষ্কের ক্ষমতা বাড়ানোর জন্য নতুন কিছু শেখা খুবই
কার্যকর। নতুন কোনো শখ তৈরি করা বা নতুন ভাষা শেখা মস্তিষ্কের স্থিতিস্থাপকতা বাড়ায়।
অনলাইনে বন্ধুদের সঙ্গে গেম খেলার মাধ্যমে সামাজিক মিথস্ক্রিয়া বাড়ানোও মস্তিষ্কের
কর্মক্ষমতা উন্নত করতে সহায়ক।
ভালোভাবে
জেগে উঠুন
দিনের শুরুতে কিভাবে ঘুম থেকে উঠছেন, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ।
ভোরবেলা সূর্যের আলো মস্তিষ্ককে ধীরে ধীরে জাগিয়ে তোলে এবং কর্টিসল হরমোনের নিঃসরণ
বাড়ায়, যা আমাদের সারা দিন চাঙ্গা থাকতে সাহায্য করে।
নেতিবাচকতা
বাদ দেওয়া
মন থেকে নেতিবাচকতা ত্যাগ করা হতে পারে মস্তিষ্কের
কর্মক্ষমতা ধরে রাখার অন্যতম উপায়। যখন কোনো একটি বিষয়ে মস্তিষ্ক উদ্বিগ্ন থাকে তখন
মস্তিষ্ক তা গ্রহণ করে ও সেভাবে প্রস্তুত হয়। এ কারণে নেতিবাচক চিন্তাগুলো মস্তিষ্কে
স্থায়ী হয়ে যায়। অন্যদিকে ইতিবাচক ও গঠনমূলক বিষয় নিয়ে চিন্তা মস্তিষ্কের কর্মক্ষমতা
বৃদ্ধি করে।
সামাজিকতা
সামাজিকতা ও ভালো স্মৃতিশক্তির একটি পারস্পরিক সম্পর্ক
রয়েছে। অর্থাৎ ভালো স্মৃতিশক্তিধারীরা বেশি সামাজিক হয়। তবে এতে কোনটির অবদান বেশি
তা নিয়ে সন্দেহ ছিল। তবে ২০০৮ সালের এক গবেষণায় দেখা যায়, যেসব অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তি
সামাজিকতায় তেমন অংশ নেন না, তাদের মস্তিষ্ক সামাজিকদের তুলনায় দ্বিগুণ হারে ক্ষয়প্রাপ্ত
হয়। গবেষকরা জানাচ্ছেন, সামাজিকতা আমাদের মস্তিষ্কের উপকার করে। সামাজিকতার ফলে নিজের
দিকে নজর দেওয়া, চাপ কমানো ও নিউরো হরমোন নিঃসরণ সহায়তা করে।
নতুন কিছু
শিখুন
নতুন কোনো কাজ শেখার চেষ্টা করলে স্মৃতিশক্তি ও বুদ্ধি
বাড়ে। এই যেমন ধরুন আপনি হয়তো কাগজের প্লেন তৈরি করতে জানেন না। সেটা শিখে নিয়ে তৈরি
করুন। কিংবা নতুন কোনো কাজ করতে শুরু করুন। স্মৃতিশক্তি বুদ্ধি এতে বাড়বে। মানসিক
চাপ এড়িয়ে চলুন। মানসিক চাপ বাড়লে স্মৃতিশক্তি কমতে শুরু করে। বন্ধু ও পরিচিতজনের
সংখ্যা বাড়ান ও তাদের সঙ্গে গড়ে তুলুন গঠনমূলক সুন্দর সামাজিক সম্পর্ক।
সামুদ্রিক
মাছ ও মাছের তেল
মানুষের
মাথার প্রায় বেশিরভাগ অংশই ফ্যাট। এই ফ্যাট ভালো পরিমাণে থাকে সামুদ্রিক খাবারে।
মাছের তেল ব্রেন সেল গঠন করে এবং মস্তিষ্কের প্রদাহ কমায় ও মস্তিষ্ককে রক্ষা করে।
এছাড়া, মাছের তেলে ওমেগা-৩ পাওয়া যায়, যা ব্রেনের জন্য উপকারী। পমফ্রেট মাছ থেকে
শুরু করে সমুদ্রের অন্যান্য মাছ খেতে পারেন। এছাড়া ইলিশ, চিংড়িও ভালো। তাই এই
মাছও খেতে পারেন।
মস্তিষ্কের ব্যায়াম
বিজ্ঞান ও গণিতের মতো যুক্তিভিত্তিক চর্চায় মস্তিষ্কের একটি অংশের ব্যায়াম হয়। আবার সৃজনশীল কাজও মস্তিষ্কের অপর অংশের জন্য জরুরি। বই পড়া, লেখালেখি, ছবি আঁকা, ছবি তোলা, ডায়েরি লেখা, ছন্দ মেলানো—সবই মস্তিষ্কের জন্য ভালো। খেলার ছলেও হয় ব্যায়াম। রুবিকস কিউব, সুডোকু, জিগস পাজল, ক্রসওয়ার্ড পাজল, দাবার মতো খেলায় রোজ কিছুটা সময় কাটাতে পারেন। কার্ড বা তাস খেলাও ভালো। অনলাইনে গেম খেলা যেতে পারে (তবে এর নেশায় বুঁদ হয়ে নয়)। শব্দ, সংখ্যা, গণিত কিংবা নানা ধরনের আকৃতি নিয়ে খেলা হতে পারে অনলাইনে কিংবা অফলাইনে (অর্থাৎ, বন্ধুরা মিলে এমন কিছু নিয়ে খেলতে পারেন; অনলাইনের চাইতে এটাই বেশি ভালো)। অনলাইনে গেম খেলতে গিয়ে শরীরে যাতে জড়তা চলে না আসে, সেদিকেও খেয়াল রাখুন। নতুন কিছু শিখতে চেষ্টা করুন। হতে পারে সেটি নতুন কোনো ভাষা। তৈরি করতে পারেন নতুন নতুন দক্ষতা। সেলাই বা বুননেও হয় মস্তিষ্কের ব্যায়াম। ঘর সাজানোর জিনিস তৈরি করতে পারেন নিজের বুদ্ধি খাটিয়ে। ফেলনা জিনিস কাজে লাগাতে পারেন অন্দরসজ্জায়। মস্তিষ্কের ব্যায়াম হবে।
প্রতিবেদনটি
লিখেছেন:
লেখক, গবেষক ও স্কাউটার—মোহাম্মদ
সাইফুদ্দিন
শিক্ষক—বায়তুশ
শরফ আদর্শ কামিল (অনার্স—মাস্টার্স) মাদরাসা
মোবাইলঃ
০১৮১৯৯৪৭৩৮৭,
ই-মেইলঃsaifuddinbaitushsharaf@gmail.com
No comments
Post a Comment